সুন্দর প্রকৃতির ছবি
সুন্দর প্রকৃতির ছবি
নিভৃত উপত্যকার সন্ধান এথেলগার্ড উপত্যকাটি কোনো আধুনিক মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যেত না। এটি ছিল উত্তরের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোর মাঝে লুকিয়ে থাকা এক স্বর্গীয় ভূমি, যা সবসময় রুপালি কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকতো। শহরের যান্ত্রিকতা আর কাঁচ-পাথরের দালানকোঠার ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া স্থপতি এলারা একদিন এই উপত্যকার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। তার কাছে ছিল কেবল একটি পুরনো ডায়েরি আর মনের গভীরে জমে থাকা একরাশ ক্লান্তি। ভোরের প্রথম আলো যখন পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ল, ঠিক তখনই এলারা সেই গোপন গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করল এক মায়াবী জগতে।
প্রকৃতির বিশালতা ও প্রশান্তি উপত্যকাটিতে পা রাখতেই এলারার শ্বাস যেন থমকে গেল। সামনে এক বিশাল প্রাকৃতিক মন্দির যেন তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। নীলকান্তমণি রঙের একটি স্বচ্ছ নদী সবুজ ঘাসের বুক চিরে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে। ঘাসের বুকে ফুটে আছে হাজারো নাম না জানা বুনোফুল—লাল, বেগুনি আর সোনালি রঙের মেলা। দূরে তুষারে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলো সূর্যের আলোয় যেন আগুনের পিরামিডের মতো জ্বলজ্বল করছিল। সেখানে সময়ের কোনো তাড়া ছিল না, ছিল কেবল এক অনন্ত স্থিরতা।
রহস্যময় উইলো গাছ ও নিস্তব্ধতার গান নদীর তীরে একা দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল প্রাচীন উইলো গাছ। তার কান্ড ছিল অনেক মোটা এবং শ্যাওলা ধরা, যা শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটির লম্বা ডালগুলো পরম মমতায় নদীর জল ছুঁয়ে যাচ্ছিল। লোকগাথায় প্রচলিত আছে যে, এই গাছটি নদীর জলের সব স্মৃতি পান করে এবং তা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এলারা যখন সেই গাছের নিচে বসল, সে এক অদ্ভুত নীরবতা অনুভব করল। এই নীরবতা শূন্যতা নয়, বরং এক পূর্ণতা। সে উপলব্ধি করল, শহরে মানুষ নীরবতাকে ভয় পায়, কিন্তু এখানে নীরবতাই হলো পৃথিবীর আসল ভাষা।
নদীর শিক্ষা ও জীবনের দর্শন কয়েক দিন সেখানে কাটানোর পর এলারা লক্ষ্য করল, নদীটি তার পথে আসা কোনো পাথরের সাথে যুদ্ধ করে না। বরং অত্যন্ত নম্রভাবে পাথরটিকে এড়িয়ে নিজের পথ তৈরি করে নেয়। এলারা বুঝতে পারল, তার জীবনের ক্লান্তি কঠোর পরিশ্রম থেকে আসেনি, বরং এসেছিল নিজের মনের বিরুদ্ধে কাজ করার ফলে। পাহাড়ের সেই স্থিরতা আর নদীর এই বহমানতা তাকে শিখিয়ে দিল যে, জীবনকে জোর করে নয়, বরং সহজভাবে গ্রহণ করাই হলো আসল মুক্তি।
ফিরে আসা এবং নতুন শুরু উপত্যকায় কাটানো দিনগুলো এলারার ভেতরের সমস্ত উদ্বেগ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিল। বিদায়লগ্নে যখন সে শেষবারের মতো পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখল, তখন সে বুঝতে পারল তাকে আবার শহরে ফিরে যেতে হবে। তবে এবার সে একা ফিরছে না; সে তার হৃদয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এথেলগার্ডের সেই প্রশান্তি। শহরে ফিরে সে আর আগের মতো প্রাণহীন দালান তৈরি করল না। বরং সে এমন সব স্থাপত্য তৈরি করতে শুরু করল যেখানে আলো-বাতাসের খেলা থাকে এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের এক নিবিড় সংযোগ গড়ে ওঠে। এলারা প্রমাণ করল যে, মনের ভেতরে যদি প্রশান্তি থাকে, তবে পাথরের জঙ্গলেও স্বর্গ তৈরি করা সম্ভব।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url