ব্যস্ত জীবন ও আখেরাতের প্রস্তুতি: আমরা কি সঠিক পথে আছি

 ব্যস্ত জীবন ও আখেরাতের প্রস্তুতি: আমরা কি সঠিক পথে আছি

আধুনিক সভ্যতার এই যান্ত্রিক যুগে আমরা সবাই এক অন্তহীন দৌড়ের ওপর আছি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ক্যারিয়ার, শিক্ষা, ব্যবসা আর সামাজিক মর্যাদার পেছনে ছুটে। এই ব্যস্ততা আমাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আমরা ভুলে যাচ্ছি—এই জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর আমাদের এক অনন্ত জীবনের মুখোমুখি হতে হবে। প্রশ্ন জাগে, এই যে আমরা দিনরাত পরিশ্রম করছি, এর কতটুকু আমাদের পরকালীন কল্যাণে আসবে? আমরা কি আখেরাতের প্রস্তুতির সঠিক পথে আছি?

১. ব্যস্ততার মায়াজাল ও বর্তমান বাস্তবতা

আমাদের চারপাশের জগত আজ ভোগবাদী। আমরা ঘর গোছাতে ব্যস্ত, কিন্তু কবরের ঘর গোছানোর কথা আমাদের মনে নেই। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়, কিন্তু সেই প্রযুক্তিই আমাদের ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাই, অথচ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আমাদের হাতে সময় নেই। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সতর্ক করে বলেছেন: "প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও।" (সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)। এই আয়াতটি আমাদের বর্তমান অবস্থার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

২. জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী?

একজন মুমিনের জন্য দুনিয়া হলো আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। এখানে আমরা যা বপন করব, পরকালে তাই কাটব। মহান আল্লাহ আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কেবল তাঁর ইবাদতের জন্য। ইবাদত মানে কেবল তসবিহ পাঠ করা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। ব্যবসা যদি সততার সাথে হয়, সেটিও ইবাদত; পরিবারকে সময় দেওয়া যদি সুন্নাহ অনুযায়ী হয়, সেটিও ইবাদত। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা দুনিয়াকে লক্ষ্য (Goal) বানিয়ে ফেলেছি আর আখেরাতকে বানিয়েছি গৌণ (Secondary)।

৩. ব্যস্ততার মাঝে আখেরাতের প্রস্তুতির উপায়

অনেকে মনে করেন, দ্বীন পালন করতে হলে বোধহয় দুনিয়া ছেড়ে বৈরাগী হতে হবে। ইসলাম তা বলে না। ইসলাম শিখিয়েছে ভারসাম্য। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আখেরাত গোছানোর কিছু ব্যবহারিক উপায় রয়েছে:

  • নামাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া: আপনার কাজের সূচি তৈরি করুন নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে। নামাজের সময় হলে কাজ বিরতি দিন। এটি কেবল ফরজ আদায় নয়, বরং এটি আপনার কাজের বরকত বাড়িয়ে দেবে।

  • নিয়ত পরিবর্তন করা: প্রতিটি কাজের শুরুতে ভাবুন—এটি করলে কি আল্লাহ খুশি হবেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সেটি নেক আমলে পরিণত হবে।

  • অল্প হলেও নিয়মিত জিকির: অফিস যাওয়ার পথে বা কাজের ফাঁকে মনে মনে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘ইস্তিগফার’ পাঠ করুন। এতে অন্তর সজীব থাকে।

  • কুরআনের সাথে সম্পর্ক: প্রতিদিন অন্তত একটি আয়াত অর্থসহ পড়ুন। এটি আপনাকে জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে।

৪. আমরা কি সঠিক পথে আছি? (আত্মউপলব্ধি)

নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। আমাদের প্রতিদিনের রুটিন কি আমাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি জাহান্নামের দিকে? যদি আমাদের দিন শুরু হয় ফোনের নোটিফিকেশন দিয়ে আর শেষ হয় নেটফ্লিক্স দেখে, তবে আমরা সঠিক পথে নেই। সঠিক পথ হলো সেই পথ, যেখানে একজন মানুষ দুনিয়ার কাজও করবে নিষ্ঠার সাথে, আবার পরকালের জবাবদিহিতার ভয়ও রাখবে অন্তরে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে।"

৫. আখলাক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

আখেরাতের প্রস্তুতি কেবল তসবিহ পাঠে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সাথে আমাদের আচরণ কেমন, তা পরকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যের হক নষ্ট করা, গীবত করা বা হিংসা পোষণ করা আমাদের সব নেক আমল ধ্বংস করে দিতে পারে। ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা যেন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না করি। আধুনিক যুদ্ধে যেমন ড্রোন বা রোবট নিয়ম বদলে দিচ্ছে, তেমনি শয়তানও আধুনিক যুগে নতুন নতুন কৌশলে আমাদের ইমান চুরি করছে। আমাদের এই ফেতনার যুগে সজাগ থাকতে হবে।

৬. মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতা

মৃত্যু কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। আমাদের আজকের এই ব্যস্ততা, এই স্বপ্ন, এই আয়োজন—সবকিছু এক নিমেষে থমকে যাবে। কবরের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে আমাদের স্মার্টফোন, ব্যাংক ব্যালেন্স বা ডিগ্রি কোনো কাজে আসবে না। সেখানে কেবল আমাদের সঙ্গী হবে ‘আমল’। রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছেন, কারণ এটি মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে এবং আখেরাতের দিকে মনোযোগী করে।

৭. ফিরে আসার সময় এখনই

তওবার দরজা সবসময় খোলা। আপনি যদি মনে করেন আপনি সঠিক পথে নেই, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আজকের এই মুহূর্ত থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব। এক ফোঁটা চোখের জল এবং আন্তরিক তওবা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ব্যস্ততাকে অজুহাত না বানিয়ে ব্যস্ততার ভেতরেই ইবাদতের সুযোগ খুঁজে নিতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে, দুনিয়া একটি মুসাফিরখানা মাত্র। মুসাফির যেমন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল থাকে, আমাদের গন্তব্যও হওয়া উচিত জান্নাত। ব্যস্ত জীবন আমাদের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে দুনিয়াকে হাতের তালুতে রাখতে হবে, কিন্তু অন্তরে রাখতে হবে আখেরাতকে। আমরা যদি আমাদের সময়কে সঠিকভাবে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে পারি, তবেই আমরা সঠিক পথে আছি বলে গণ্য হব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url